বৈশ্বিক শেয়ারবাজারের অধিকাংশ সূচক নিম্নমুখী প্রবণতায়

বৈশ্বিক শেয়ারবাজারে গতকাল অধিকাংশ সূচকই ছিল নিম্নমুখী প্রবণতায়। এক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রেখেছে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাংক খাত নিয়ে আশঙ্কা।

বৈশ্বিক শেয়ারবাজারে গতকাল অধিকাংশ সূচকই ছিল নিম্নমুখী প্রবণতায়। এক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রেখেছে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাংক খাত নিয়ে আশঙ্কা। ওয়াল স্ট্রিটে এখন আঞ্চলিক ব্যাংকগুলোর শেয়ারে দেখা যাচ্ছে বড় ধরনের বিক্রয়চাপ। বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতিতে ব্যবসায়িক খাতে ঋণপ্রবাহ নেটওয়ার্কের ওপর ক্রমবর্ধমান চাপ নিয়ে উদ্বেগের কারণে বৃহস্পতিবার ওয়াল স্ট্রিটে বড় ধরনের ধস নামে। এশিয়া ও ইউরোপের শেয়ারবাজারেও গতকাল এ ধসের প্রভাব দেখা যায়। খবর এফটি, রয়টার্স ও গার্ডিয়ান।

যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক ও ব্যাংক খাতের বর্তমান পরিস্থিতি ইউরোপ ও এশিয়ায়ও বড় ধরনের আশঙ্কা তৈরি করেছে। এর প্রভাবে গতকাল ভারতের বিএসই সেনসেক্স ছাড়া এশিয়া-প্যাসিফিকের অধিকাংশ শেয়ার সূচকই পতনের মধ্য দিয়ে গেছে। এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে চীনে গতকাল সাংহাইয়ে এসই কম্পোজিট ইনডেক্সের পতন হয়েছে ১ দশমিক ৯৫ শতাংশ। জাপানে নিক্কেই ২২৫ সূচকের পতন হয়েছে ১ দশমিক ৪৪ শতাংশ। হংকংয়ে হ্যাংসেং সূচকের পতন হয়েছে ২ দশমিক ৪৮ শতাংশ। থাইল্যান্ডে ১ দশমিক ৩ শতাংশ কমেছে এসইটি আইডিএক্স সূচক। দশমিক ৩২ শতাংশ কমেছে এফটিএসই বুরসা মালয়েশিয়া কেএলসিআই সূচক। করাচি স্টক এক্সচেঞ্জে কেএসই ১০০ সূচক কমেছে দশমিক ৩৫ শতাংশ। অস্ট্রেলিয়ায় এসঅ্যান্ডপি/এএসএক্স ২০০ সূচকের পতন হয়েছে দশমিক ৮৮ শতাংশ। কেবল ভারতে বিএসই সেনসেক্স সূচক বেড়েছে দশমিক ৫৮ শতাংশ।

ইউরোপের বাজারে প্রধান সূচকের প্রায় সবই গতকাল ছিল নিম্নমুখী ধারায়। এখানকার বৃহৎ সূচকগুলোর মধ্যে জার্মানিতে ডয়চে বোর্স ডিএএক্স সূচক কমেছে ১ দশমিক ৭৯ শতাংশ। ফ্রান্সে সিএসি ৪০ সূচকের পতন হয়েছে দশমিক ১৫ শতাংশ। স্পেনে মাদ্রিদ এসই ইনডেক্স কমেছে দশমিক ৬৪ শতাংশ। ইউরোজোনের শেয়ার সূচক ইউরোস্টক্স ৫০-এর পতন হয়েছে দশমিক ৮৯ শতাংশ। লন্ডনে এফটিএসই ১০০ সূচকের পতনের হার ছিল ১ দশমিক ১৩ শতাংশ।

যুক্তরাষ্ট্রে ডাও জোনস ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যাভারেজে পতনের হার ছিল দশমিক ৬৫ শতাংশ। দশমিক ৪৭ শতাংশ কমেছে নাসডাক কম্পোজিট ইনডেক্স। এসঅ্যান্ডপি ৫০০-এর পতন হয়েছে দশমিক ৬৩ শতাংশ।

মার্কিন শেয়ারবাজারের স্বল্পমেয়াদি অস্থিরতার পরিমাপক ভিক্স ইনডেক্সকে বলা হয় ওয়াল স্ট্রিটের ‘ভয়ের সূচক’। এটি এখন এপ্রিলের পর সর্বোচ্চ ২৮ পয়েন্টে অবস্থান করছে।

এ পরিস্থিতির সূত্রপাত গত বৃহস্পতিবার মার্কিন দুটি আঞ্চলিক ব্যাংকের ঋণসংক্রান্ত বক্তব্য প্রকাশের পর। ওইদিন ইউটাহ-ভিত্তিক ঋণদাতা জায়ন্স ব্যাংকরপোরেশন জানায়, প্রতিষ্ঠানটি দুটি ঋণের ৫ কোটি ডলারকে খেলাপি হিসেবে ঘোষণা করতে যাচ্ছে। একই দিনে ফিনিক্স-ভিত্তিক ওয়েস্টার্ন অ্যালায়েন্স জানায়, ১০ কোটি ডলারের একটি মন্দ ঋণ নিয়ে এরই মধ্যে আইনি পদক্ষেপ নিতে শুরু করেছে প্রতিষ্ঠানটি।

ব্যাংক দুটির এ মন্দ ও খেলাপি ঋণের ঘোষণা বিনিয়োগকারীদের মধ্যে বড় ধরনের উদ্বেগ তৈরি করে। এ বিষয়ে ডয়চে ব্যাংকের বিশ্লেষক জিম রিড বলেন, ‘যদিও ঘটনাটি আপাতদৃষ্টিতে এমন দুটি ব্যাংককে ঘিরে, যাদের বাজারমূল্য ১০ বিলিয়ন ডলারেরও কম। কিন্তু ঘটনা দুটিকে এখন ২০২৩ সালে সিলিকন ভ্যালি ব্যাংকের ধসের পর আঞ্চলিক ব্যাংকিং খাতে দেখা দেয়া চাপের সঙ্গে মেলাচ্ছেন বিনিয়োগকারীরা। এতে দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চ সুদহার ও বেসরকারি ঋণ বাজারের সম্প্রসারণের পর এখন ঋণের মানসংক্রান্ত সমস্যাগুলো নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।

তিনি আরো জানান, বাজার এখন বিশেষভাবে সম্ভাব্য ডোমিনো ইফেক্টের আশঙ্কায় সতর্ক। কারণ গত মাসেই সাবপ্রাইম গাড়ি ঋণদাতা প্রতিষ্ঠান ট্রাইকালার নিজেকে দেউলিয়া বলে ঘোষণা দিয়েছে। এরপর এ দুই ব্যাংকের প্রদত্ত ঋণ নিয়ে সৃষ্ট সংকট বাজারে নতুন করে আশঙ্কা তৈরি করেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের আঞ্চলিক ব্যাংকিং খাত আগে থেকেই নিয়ন্ত্রক ও বিনিয়োগকারীদের সতর্ক পর্যবেক্ষণের মধ্যে রয়েছে। গত মাসের শেষ দিকে গাড়ির যন্ত্রাংশ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ফার্স্ট ব্র্যান্ডস ঋণদাতাদের উদ্বেগের কারণে দেউলিয়াত্ব ও সুরক্ষার আবেদন জানায়। দেউলিয়াসংক্রান্ত আবেদনে ফার্স্ট ব্র্যান্ডস জানায়, তাদের দায় কমপক্ষে ১ হাজার কোটি থেকে সর্বোচ্চ ৫ হাজার কোটি ডলারের মধ্যে। যেখানে প্রতিষ্ঠানটির সম্পদের পরিমাণ মাত্র ১০০ কোটি থেকে ১ হাজার কোটি ডলার। মূলত ব্যালান্স শিট-বহির্ভূত ঝুঁকিপূর্ণ অর্থায়নের কারণে এ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। এতে অর্থায়নকারী ব্যাংকগুলো এখন বিপাকে পড়ে গেছে।

ইন্টারঅ্যাকটিভ ইনভেস্টরের মার্কেটস বিভাগের প্রধান রিচার্ড হান্টার বলেন, ‘বাজারের ওপর ঘনিয়ে আসা ঝড়ের ইঙ্গিত ক্রমেই বাড়ছে। একই সঙ্গে বড় হচ্ছে উদ্বেগও, যেখানে স্বস্তির কোনো লক্ষণ তেমন নেই।’

ওয়েস্টার্ন অ্যালায়েন্স ও জায়নসের বক্তব্য প্রকাশের পর বৃহস্পতিবার যুক্তরাষ্ট্রে কেবিডব্লিউ আঞ্চলিক ব্যাংক সূচক এক ধাক্কায় ৬ দশমিক ৩ শতাংশ হারায়। দেশটির ঋণবাজার নিয়ে এখন নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে বিনিয়োগকারীরা এখন ঝুঁকি নেয়া কমিয়ে দিচ্ছেন। শেয়ারবাজারে গত কয়েক মাসে এআইয়ের উত্থানজনিত বড় ধরনের উত্থান দেখা গেছে। বাজারে এখন তথাকথিত এআই বাবল তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন বিনিয়োগকারীরা, যা পরবর্তী সময়ে বড় ধরনের ধসের কারণ হয়ে উঠতে পারে বলে আশঙ্কা তাদের।

এ ঘটনার প্রভাবে এখন অন্যান্য অঞ্চলেও ব্যাংক ও আর্থিক খাত নিয়ে বড় ধরনের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। গতকাল ইউরোপের বাজারে ব্যাংক খাতের শেয়ার সূচক স্টক্স ইউরোপ ৬০০ সূচকের পতন হয় ১ দশমিক ৬ শতাংশ। এর বিপরীতে নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচিত সরকারি বন্ডগুলোর দাম বেড়ে যায়।

টিডি সিকিউরিটিজের রেটস স্ট্র্যাটেজিস্ট পূজা কুমরা বলেন, ‘বাজার এখন ব্যাংক বা ঋণপ্রবাহে ধস নামার সম্ভাব্য যেকোনো ইঙ্গিতের প্রতি অত্যন্ত সংবেদনশীল হয়ে উঠেছে। কারণ সবকিছুই এখন অতিমূল্যায়িত।’

আরও